লোকটা জানলই না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়। LOKTA JANLOI NA BY SUBHAS MUKHOPADHAY



লোকটা জানলই না

সুভাষ মুখোপাধ্যায়



বাঁ দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে
হায় হায়
লোকটার ইহকাল পরকাল গেল।
অথচ
আর একটু নিচে
হাত দিলেই সে পেত
আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ
তার হৃদয়
লোকটা জানলই না।
তার কড়িগাছে কড়ি হল
লক্ষ্মী এলেন
রণ পায়ে।
দেয়াল দিল পাহাড়া
ছোটলোক হাওয়া
যেন ঢুকতে না পারে।
তারপর
একদিন গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে
কখন
খসে পরলো তার জীবন
লোকটা জানলই না।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কবি। তাঁর কবিতার মধ্যে সাধারণ মানুষের কথা ও সমাজের কথা বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। মানুষের স্বার্থপরতা, নীচতা, সমাজের কদর্য রূপ তাঁর কবিতায় যেমন আছে তেমনি ভাবে শেষ পর্যন্ত মানুষের উপরে তিনি আস্থা রেখেছেন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে বিশ্লেষন করেছেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, করতেন হাতে হাত রেখে মানুষ একদিন এই সমাজ ও দেশকে শান্তির আশ্রয়স্থল করে তুলবে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানুষের কবি, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শোষনহীন এবং উন্নততর এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা "লোকটা জানলই না" কবিতাটি তাঁর "শ্রেষ্ঠ কবিতা" কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।



এই কবিতায় তিনি স্বার্থসর্বস্ব মানুষের জীবনের অর্থহীনতার পরিচয় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থ উপার্জনের বাসনায় মানুষ কেবলই ছুটে চলেছে। অর্থ উপার্জনে মত্ত থেকে মানুষ ভুলে যায় জীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য। অথচ, অর্থের চিন্তা দূরে সরিয়ে রেখে জীবনকে উপভোগ করতে জানলে মানুষ বুঝতে পারত জীবন অমূল্য।

কবিতার প্রথমে আছে,
"বাঁ দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে
হায় হায়
লোকটার ইহকাল পরকাল গেল।"
এখানে বুকপকেট বলতে জামার উপরে বাম দিকে টাকাপয়সা রাখার জন্য যে পকেটে থাকে, সেই স্থানকে বলা হয়েছে। এ কথার মধ্য দিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানুষের অর্থের প্রতি লোভকে প্রকাশ করেছেন। সমাজে কিছু মানুষ আছেন যারা সারা জীবন টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ জীবন কাটিয়ে দিলেন। টাকা পয়সা ছাড়া জীবনের অন্য অর্থ আছে তা তারা বুঝলেন না। অর্থ সর্বস্ব মানুষগুলি অর্থ উপার্জনের নেশায় জীবনের প্রকৃত আনন্দ ভোগ করতে পারলে না। তাই তোদের ইহকাল গেল। ইহকাল শব্দের অর্থ পার্থিব জীবন। একসঙ্গে তাদের পরকালও নষ্ট হল। অর্থের হিসাব করতে ব্যস্ত মানুষ পৃথিবীতে এমন কোন ভাল কাজ করে যেতে পারেন না যা তার মৃত্যুর পরে থাকবে। জীবনে কোন মহৎ কর্ম সাধনের মধ্য দিয়ে মানুষ মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে থাকেন। কিন্তু সুযোগসন্ধানী মানুষটি বা মানুষরা তেমন কোনো কর্ম করতে পারেন না বলে তাদের পরকাল নষ্ট হল।

এরপরে আছে,
"অথচ
আরেকটু নিচে
হাত দিলেই সে পেত
আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ
তার হৃদয়
লোকটা জানলই না।"
অর্থাৎ ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা বাদ দিয়ে মানুষের উচিত হৃদয়ের ধর্ম পালন করা। পকেট এর নিচে আছে হৃদয়। পকেটের সুখের বদলে হৃদয়ের সুখ প্রধান কামনার বস্তু হওয়া উচিত। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হল রূপকথার গল্পের প্রসঙ্গ বিশেষ। রূপকথার গল্পে আছে আলাদিনের কাছে একটি প্রদীপ ছিল, যা তার সব মনস্কামনা পূর্ণ করে দিত। তেমনি ভাবে মানুষের হৃদয় হল আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ, যা তার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে। জীবনকে যথার্থভাবে উপভোগ করতে হলে প্রথমে হৃদয়ের দাবিকে পূর্ণ করতে হবে। জীবন অমূল্য, তুচ্ছ অর্থ চিন্তা করে এই অমূল্য জীবনকে নষ্ট করা উচিত নয়। অথচ স্বার্থমগ্ন মানুষ এই সরল সত্য কথাটি বুঝলো না।

কবিতায় এরপরে আছে,
"তার কড়ি গাছে কড়ি হলো
লক্ষ্মী এলেন
রন-পায়ে।"
অর্থাৎ অর্থের সাধনা করতে করতে মানুষ একদিন অর্থ লাভ করল। লক্ষ্মী হলেন সম্পদের দেবী। বাঁ দিকের বুক পকেটে সামলাতে সামলাতে মানুষ সম্পদ অর্জন করলো ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত সুখ পেল না। কড়ি গাছে কড়ি হল এবং লক্ষ্মী এলেন এই কথা দুটির মাধ্যমে তার সম্পদ লাভের এবং বড়লোক হয়ে ওঠার কথা বোঝানো হয়েছে। অর্থের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলেও জীবনের আকাঙ্ক্ষা যে মিটলো না সে কথা কবি বুঝিয়েছেন, লক্ষ্মী দেবীর রনপায়ে আসার ব্যঞ্জনায়।




এরপর আছে,
" দেয়াল দিল পাহাড়া
ছোটলোক হাওয়া
যেন ঢুকতে না পারে। "
অর্থাৎ, সম্পদ অর্জন করার পর মানুষ আরো বেশী স্বার্থমগ্ন হয়ে পড়ল। অর্থ এবং সম্পদ উপভোগ করতে সাহায্য করে। কিন্তু মানুষটি জীবনকে উপভোগ করার জন্য সম্পদ অর্জন করে নাই। লক্ষ্মী দেবীকে চারদিকে দেওয়াল তুলে বন্দী করে রাখল। সমাজে তৈরি হলো শ্রেণী বিভাজন। কিছু মানুষ সম্পদকে নিজেদের অধিকারে রেখে সমাজে কৃত্রিম অভাব তৈরি করল। আর কিছু মানুষ সম্পদের অভাবে খাদ্যহীন, বাসস্থানহীন হয়ে জীবনের যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকলো। এই অসমতা কখনো কাম্য হতে পারে না। পৃথিবীর সম্পদে সকল মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু, পৃথিবীর ইতিহাস হল বঞ্চনার ইতিহাস। বিত্তবান মানুষরা মানুষকে ঘৃণা করে ও বঞ্চনা করে নিজেদের ইহকাল ও পরকাল যেমন নষ্ট করল, তেমনই অন্যান্য মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

এরপরে আছে,
" একদিন গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
দু আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে
কখন
খসে পড়ল তার জীবন
লোকটা জানলই না। "
গোগ্রাসে খাওয়ার অর্থ গরুর মত না চিবিয়ে গিলে খাওয়া। গোগ্রাসে খাওয়ায় কোন স্বাদ থাকে না। বিত্তবান মানুষরা তেমনি জীবনের স্বাদ উপভোগ করতে পারেনা। মানুষকে বঞ্চনা করে স্বার্থপর মানুষেরা যে অর্থ উপার্জন করে, তাতে জীবনের দাবি মেটেনা। আজকে ভালোবেসে মানুষের পাশে থাকার মধ্যে প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে আছে। মানুষের সেবায় আত্মত্যাগ করলে তবে প্রকৃত আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু অর্থের লোভে অন্ধ মানুষরা এই সত্য কথাটি বুঝতে পারল না। অর্থ ও সম্পদের পাহাড় গড়তে গড়তে একদিন তার অমূল্য জীবন খসে পড়ল, অর্থাৎ মৃত্যু হলো তার। স্বার্থপর মানুষের মৃত্যুতে গৌরব থাকেনা। দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে জীবন খসে পড়ার অর্থ কোন উদ্দেশ্যহীনভাবে মরে যাওয়া। দু আঙ্গুল দিয়ে টাকা গুনতে গুনতে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে কখন যে মহা মূল্যবান জীবন খসে পড়ে তার হিসাব রাখে না সে। অথচ অর্থের চিন্তায় মগ্ন না থেকে, মানুষের পাশে থেকে হৃদয়ের দাবী কে পূর্ণ করলে তার ইহকাল এবং পরকাল উজ্জ্বল হতে পারত। তা সে করল না।

কবিতাটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একজন স্বার্থপর মানুষের ছবি এঁকেছে। জীবনে প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে অক্ষম একজন মানুষ কিভাবে নিজেকে ঠকায় এবং দেশ ও সমাজের দুঃখের কারণ হয় তার ছবি আছে এই কবিতায়। মানুষটি জীবনের সুখ বলে সারা জীবন অর্থ চিন্তা করে গেল, অর্থ উপার্জন করল, কিন্তু জীবন তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। লোকটি জানলোই না কিভাবে জীবন উপভোগ করতে হয়। কবিতার নাম "লোকটা জানলই না" কবিতার প্রকৃত ব্যঞ্জনাটিকে সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছে। তাই কবিতার নামটি যথার্থ হয়েছে।

সমাপ্ত।

#সুভাষ_মুখোপাধ্যায় #বাংলা_কবিতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেনাপাওনা ছোটগল্পের বিশ্লেষণ। Bengali short story Denapaona by Ravindranath Tagore.

দেনা পাওনারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


রবীন্দ্রনাথের সমাজ সমস্যা মূলক একটি সার্থক ছোটগল্প দেনাপাওনা। পণপ্রথা আমাদের সমাজের একটি নিদারুণ অভিশাপ। সমাজের সবচেয়ে কোমল যে অংশ স্নেহ ভালবাসায় ভরা, নবজীবন ও যৌবনের স্বপ্নে বিভোর যে তরুনীর মন, তাকে এই নিষ্ঠুর প্রথার যূপকাষ্ঠে আত্মবলিদান দিতে হয়। বিবাহ দুটি তরুন-তরুনীর হৃদয়ের মিলন এবং একই সঙ্গে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক। কিন্তু পণপ্রথা এই শুভ সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। শেষ পর্যন্ত নববধূকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর অতল গহবরে। ভালোবাসার হৃদয় বিনিময় টাকাকড়ির দেনাপাওনা এ পরিণত হয়! সভ্য, শিক্ষিত, বিত্তবান বাড়ির অভিভাবকরাও এই কুপ্রথার বশবর্তি হয়ে নববধূর সঙ্গে যে কি নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে, রবীন্দ্রনাথ গল্পটিতে তার বাস্তব ছবি এঁকেছেন। এমন পরিস্থিতিতে স্নেহ ভালবাসার মানবিক দাবিকে উপেক্ষা করে অর্থবিত্তের দানবিক দাবি বড় হয়ে ওঠে। একান্ত আপনজনকে মর্মান্তিক আঘাত দিতে সে দ্বিধা বোধ করে না। এমনি একটি ট্রাজিক রসের গল্প দেনা পাওনা।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিরুপমা বাবা মায়ের নয়নমনি। পাঁচ ছেলের পর এই মেয়েকে পেয়ে রামসুন্দরের আনন্দের শেষ ছিল না। স্নেহে যত্নে একে বড় করেছে রামসুন্দর। বিবাহযোগ্যা হলে নিরুপমার যোগ্য পাত্র মিললো। পাত্রের পিতা রায় বাহাদুর এর সঙ্গে রামসুন্দরের পাকা কথা হল 10000 টাকা পণ। বিষয়ে বুদ্ধিহীন আবেগপ্রবণ রামসুন্দর রাজি হয়ে গেল। কিন্তু টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে সে বিপাকে পড়ল। চড়া সুদে যে ধার দিতে রাজি হয়েছিল, বিয়ের দিন সে পিছিয়ে গেল। পণ নিয়ে বিয়ের আসরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। নগদ টাকা হাতে না পেয়ে রায় বাহাদুর বেঁকে বসলেন। রামসুন্দরের অনুরোধে কান দিলেন না। এই সংকটে অভাবিতভাবে পাত্র নিজে পিতার অবাধ্য হয়ে বসলো। পিতার অমতে একরকম স্বেচ্ছায় নিরুপমাকে বিয়ে করল। সবাই বুঝলো, এর ফল ভালো হবে না।

বিয়ের পর নিরুপমাকে বাবা মায়ের কাছে রেখে তার স্বামী কর্মস্থলে ফিরে গেলেন। এবারের শ্বশুরবাড়ি দিন দিন জতুগৃহ হয়ে উঠতে লাগলো। মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলে রামসুন্দর বাইরের ঘরে কোনদিন মেয়ের দেখা পায়, কোনদিন হয়তো দেখা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। পণের 6-7 হাজার টাকা দেওয়া হয়নি বলে রায় বাহাদুর এই সম্পর্ককে স্বীকার করতে চান না। একবার ধার করে 2-3 হাজার টাকা দিতে এসে রামসুন্দর বেশ অপমানিত হয়ে ফিরে গিয়েছিল। রামসুন্দর বুঝেছে, পুরো টাকা না দেওয়া পর্যন্ত নিরুপমাকে সে নিজের গৃহে নিয়ে আসার অনুমতি পাবে না। অসহায় স্নেহময় পিতার মর্মযন্ত্রণা দু-একটি রেখায় লেখক মূর্ত করে তুলেছেন।

এদিকে সুচতুর শাশুড়ি নিরুপমার উপর নির্মম মানসিক কিরণ করে চলেছেন। নববধূ যেন তাদের গৃহে অনধিকার প্রবেশ করেছে। শাশুড়ির প্রশ্রয়প্রাপ্ত বাড়ির দাস-দাসীরা তাকে কৃপার চোখে দেখে। সকলের নিদারুণ উপেক্ষায় ও বিরূপতায় এই বন্দিদশা তার পক্ষে দুঃসহ হয়ে ওঠে। সে নিয়মিত আহারাদি করে না। তীব্র মানসিক কষ্টে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বুদ্ধিমতী শাশুড়ি বধূর অসুস্থতাকে নিছক সাজানো ভান সাব্যস্ত করলেন। সুতরাং নিরুপমা শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেও তার চিকিৎসার কোন প্রশ্ন উঠল না।

শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের এই নির্যাতন রামসুন্দরকে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত করে তুলল। মেয়ের দুঃখ ঘোচাতে রামসুন্দর গোপনে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করতে লাগলো। নিজের বসত বাড়ি বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করল। তারপর, পণের বাকি টাকা নিয়ে রায়বাহাদুরের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হল। রামসুন্দরের বড় আশা, এবার অন্তত কিছু দিনের জন্য মেয়েকে নিজের কাছে এনে রাখতে পারবে। কিন্তু সত্য গোপন থাকলো না। বাড়ি বিক্রির কথা জেনে দাদারা একেবারে ভেঙে পড়ল। তারা রামসুন্দরকে অনেক বাধা দেবার অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু ফল কিছু হলো না। সমস্ত পরিবারটিকে নিরাশ্রয় করতে বাধা দিল নিরুপমা। সে স্পষ্ট বলল, সে এই বাড়ির বধূ, টাকার থলি মাত্র নয়। অর্থের বিনিময়ে তার প্রাণের মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না। মেয়ের যুক্তির কাছে হার মেনে ফিরে গেল রামসুন্দর।

এই সংবাদ গোপন থাকলো না। দাসীদের মাধ্যমে শাশুড়ির কানে তা পৌঁছে গেল। শুরু হলো নিদারুণ উৎপীড়ন। নিরুপমার রোগ বেড়ে চলল। শেষে সত্যই একদিন রায় বাড়িতে ডাক্তার ডাকা হল, সেই প্রথম এবং সেই শেষ। চিকিৎসার কোনো সুযোগ না দিয়ে নিরুপমার অকাল মৃত্যু ঘটলো। পরে অবশ্য, রায়বাড়ির যথোচিত মর্যাদা রেখে মহা ধুমধামের সঙ্গে এ-বাড়ির বধুর অন্তেষ্টি ক্রিয়া সুসম্পন্ন করা হয়েছিল। জীবিতকে যতই লাঞ্ছনা করা হোক, মৃতের প্রতি অমর্যাদা শাস্ত্রবিরুদ্ধ মহাপাপ। গল্পের উপসংহার এই ভয়ঙ্কর সমাজ সমস্যার কদর্য রূপটি উদঘাটিত হয়েছে। নিরুপমা স্বামী নতুন সংসার পাতার জন্য স্ত্রীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেবার জন্য বাড়িতে চিঠি দিয়েছিল। উত্তরে নিরুপমার শাশুড়ি জানিয়েছিল, " এবারে বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়।" এই শেষ বাক্যে পণপ্রথার বিরুদ্ধে লেখকঃ রবীন্দ্রনাথের বিদ্রূপ ও শৈল্পিক প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে।

অনুসর্গ,বিভক্তি,নির্দেশক. Anusarga-Bivokti-Nirdeshak-Suffix-Indicator

অনুসর্গ,বিভক্তি,নির্দেশক
অসীম বৈরাগ্য

প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী, আশা করি সকলে ভালো আছো। এই ভিডিওতে আমি বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে আলোচনা করব। বাংলা ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার জন্য বাংলা ব্যাকরণ শিক্ষা আবশ্যিক। আর, বাংলা ব্যাকরণ এর প্রাথমিক অংশ হলো কিভাবে শব্দ গঠন করতে হয় এবং পদ গঠন করতে হয়। বাংলা শব্দ গঠন করার ক্ষেত্রে নির্দেশক এর ভূমিকা আছে। আর কোন শব্দকে পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিভক্তি এবং অনুসর্গের গুরুত্ব আছে। এই ভিডিওতে আমি বিভক্তি, অনুসর্গ, নির্দেশক সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব। উপযুক্ত উদাহরণ সহ আমি বিভক্তি, নির্দেশক এবং অনুসর্গ বিষয়টি তোমাদের বুঝিয়ে দেব এবং একই সঙ্গে বিভক্তি ও অনুসর্গ এবং নির্দেশক এর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পার্থক্য বিষয়ে আলোচনা করব। এই ভিডিওটি স্কিপ না করে শেষ পর্যন্ত দেখো, তাহলে বাংলা শব্দ এবং বাংলা পদ গঠনের কৌশলগুলি সম্পর্কে জানতে পারবে। আলোচনা শুরু করার আগে বলে রাখি, যে সমস্ত দর্শকবৃন্দ এবং ছাত্রবৃন্দ এখনো চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করো নাই, তারা এই চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করে নাও এবং আমার এডুকেশনাল ভিডিওগুলির নোটিফিকেশন পাওয়ার জন্য বেল আইকনটি একটিভ করে রাখ। চলো ভিডিওটি শুরু করা যাক।


অনুসর্গ:
প্রথমে আসি, অনুসর্গের আলোচনায়। বাংলায় কিছু অব্যয় পদ আছে, যেগুলি শব্দের পরে বসে বিভক্তির মতো কাজ করে। এই ধরনের অব্যয়গুলিকে অনুসর্গ বা পরসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় বলে।
যেমন - দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক, বিনা, চেয়ে ইত্যাদি।
অনুসর্গ দুই প্রকার:
1.শব্দজাত অনুসর্গ,
2.ক্রিয়াজাত অনুসর্গ।
শব্দজাত অনুসর্গ: বাংলায় ব্যবহৃত অধিকাংশ অনুসর্গ শব্দজাত অনুসর্গ।
শব্দজাত অনুসর্গের কয়েকটি ভাগ আছে।
এর একটি হল, তৎসম শব্দজাত অনুসর্গ। যেমন- অপেক্ষা,জন্য, দ্বারা, নিকট, নিমিত্ত, প্রতি, বিনা, মধ্যে, সঙ্গে।
তদ্ভব শব্দজাত অনুসর্গ: আগে, কাছে, পানে, বই, সাথে ইত্যাদি।
বিদেশি শব্দজাত অনুসর্গ: বাদে, বরাবর, বদলে ইত্যাদি।
এই শব্দ যাত অনুসর্গ গুলি ছাড়া, কতকগুলি অসমাপিকা ক্রিয়াপদ আছে যেগুলি বিভিন্ন কারকের অর্থ বোঝাতে বাক্যের মধ্যে ব্যবহার করা হয়।
যেমন: 1.করিয়া, করে।
 হাতে করে আমি জিনিসটা আনলাম।
লোহার চেয়ে   সোনা দামি।
2. দিয়া, দিয়ে।
ছেলেটি কলম দিয়ে লিখছে
3. ধরিয়া, ধরে।
আমি সারাদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
4. বলিয়া, বলে।
সে কথা দিয়েছিল বলে এসেছে।
5.লাগিয়া, লেগে।
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধলাম।
6. হইতে, হতে।
গাছ হতে ফল পড়ল।
তাহলে তোমরা দেখলে, অনুসর্গ কাকে বলে, অনুসর্গ কত প্রকার হতে পারে। এখন, অনুসর্গের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছি:
1.অধিকাংশ সময় অনুসর্গ নাম পদের পরে বসে।
2.তবে কখনো কখনো অনুসর্গ নাম পদের আগে বসতে পারে। যেমন- বিনা মেঘে বজ্রপাত।
3.অনুসর্গ শব্দের অর্থের পরিবর্তন করে না।
4.অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে। তাই বাক্যের মধ্যে অনুসর্গের স্বতন্ত্র প্রয়োগ আছে।
5.অনুসর্গ বিভক্তির মতো কাজ করে।
6. শব্দের পরে শুধু একটা অনুসর্গের ব্যবহার করা যায়।
7.  অনুসর্গ অব্যয় জাতীয় এবং ক্রিয়াজাত দুই প্রকার হতে পারে।
এই শব্দজাত অনুসর্গগুলি ছাড়া, কতকগুলি অসমাপিকা ক্রিয়াপদ আছে যেগুলি বিভিন্ন কারকের অর্থ বোঝাতে অনুসর্গের মতো ব্যবহার করা হয়।
যেমন- করিয়া, করে।
হাতে করে আমি জিনিসটা আনলাম।
চেয়ে: লোহার চেয়ে সোনা দামি।
দিয়া, দিয়ে: ছেলেটি কলম দিয়ে লিখছে।
ধরিয়া, ধরে: আমি সারাদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
বলিয়া, বলে: সে কথা দিয়েছিল বলে এসেছে।
লাগিয়া: সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধলাম।


বিভক্তি:
অনুসর্গের পরে এখন, আমি বিভক্তির আলোচনা করছি। বাংলা পদ গঠন করার সময় এবং কারক নির্ণয় করার সময় বিভক্তির আলোচনা আবশ্যিকভাবে এসে পড়ে।
বিভক্তি হলো ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ, যা শব্দের পরে যুক্ত হয়ে শব্দকে পদে পরিণত করে এবং বাক্যে পদটির কারক চিনিয়ে দেয়। বিভক্তি শব্দটির সাধারণ অর্থ বিভাজন করা। বাংলা ভাষায় কারক বিভক্তি আছে মাত্র পাঁচটি। যেমন- শূন্য, এ, কে, রে, এবং তে। বাংলায় কোনো কারকের জন্য নির্দিষ্ট বিভক্তি নেই। শূন্য বিভক্তি এবং এ বিভক্তি বাংলায় প্রায় সকল কারকে প্রয়োগ করা যায়। যেসব বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহার করা হয়, তাদের তির্যক বিভক্তি বলা হয়। যেমন এ, তে, কে ইত্যাদি। বিভক্তি দেখে বাংলায় কারক নির্ণয় করা জটিল, অর্থ বুঝে কারক নির্ণয় করতে হয়।
শব্দ বিভক্তি ছাড়া, আছে ধাতু বিভক্তিবিভক্তি। পুরুষভেদে যেসব বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দ ও ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে ক্রিয়া পদ গঠন করে, সেই বর্ণ বা বর্ণসমষ্টিকে ধাতু বিভক্তি বা ক্রিয়াবিভক্তি বলা হয়। যেমন “কর” ধাতুর সাথে ই বিভক্তি যোগ করলে হয় – করি। আবার, “কর” ধাতুর সঙ্গে এ বিভক্তি যোগ করলে হয় করে। এ,ই- এগুলি হল ধাতু বিভক্তি।
অনুসর্গ এবং বিভক্তির আলোচনার পরে এখন আমি অনুসর্গ এবং বিভক্তির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করছি।
1. শব্দ বিভক্তির নিজস্ব কোন অর্থ নেই, অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে।
2. শব্দ বিভক্তির স্বতন্ত্র প্রয়োগ নেই, কিন্তু অনুসর্গের স্বতন্ত্র প্রয়োগ আছে।
3. শব্দ বিভক্তি শব্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, অনুসর্গ পৃথকভাবে বসে।
4. শব্দ বিভক্তি সব সময় শব্দের শেষে বসে, অনুসর্গ কখনো কখনো শব্দের পূর্বে বসতে পারে। যেমন - বিনা মেঘে বজ্রপাত. এখানে বিনা এই অনুসর্গটি মেঘ এই বিশেষ্য পদের পূর্বে বসেছে।
নির্দেশক:
এমন অনেক শব্দ বা শব্দাংশ আছে যেগুলি বিশেষ্য, বিশেষণ ও সংখ্যাবাচক বিশেষণ এর পরে যুক্ত হয়ে বিশেষ্য বা বিশেষণকে বিশেষভাবে নির্দেশ করে, তাদের নির্দেশক বলে। যেমন – টি, টা খানি, খানা, টুকু, টুকুন, গাছ, গাছা, গাছি ইত্যাদি।
বাংলা বাক্যে টি এবং টা একই অর্থ বহন করে। যেমন- একটা কলম কিনেছি। একটি কলম কিনেছি।
পরিমাণে  অল্প আদর বুঝাতে টুকু এবং টুকুন এই দুটি নির্দেশক ব্যবহার করি। যেমন- এই টাকাটুকু সম্বল করে এতোটুকুন ছেলে বাজারে এসেছে।
খান, খানি, খানা- এই তিনটি নির্দেশক আদর, অবজ্ঞা, তুচ্ছতা ইত্যাদি বোঝাতে ব্যবহার করি। যেমন - বাড়িখানা খুব সুন্দর। একটুখানি জায়গায় এত বড় বাড়ি করেছ!
নির্দেশকের সঙ্গে বিভক্তির পার্থক্য আছে:
1. বিভক্তি কারক নির্দেশ করতে পারে, নির্দেশক কারক নির্দেশ করতে পারে না।
2. কোন শব্দের সঙ্গে বিভক্তি যোগ করলে পদ তৈরি হয়, শব্দের সঙ্গে নির্দেশক যোগ করলে পদ তৈরি হয় না।
3. নির্দেশক কোন শব্দের বচন নির্দেশ করে, বিভক্তি বচন নির্দেশ করেনা।
পার্থক্য থাকলেও নির্দেশকের সঙ্গে বিভক্তির মিল আছে।
1. নির্দেশক এবং বিভক্তি উভয়ের কোন অর্থ নেই।
2. নির্দেশক এবং বিভক্তি উভয়ই শব্দের পরে বসে।
নির্দেশকের সঙ্গে অনুসর্গের পার্থক্য আছে :
1. অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে, নির্দেশক এর নিজস্ব অর্থ নেই।
2. অনুসর্গ শব্দের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে বসতে পারে, নির্দেশক শব্দের মধ্যে পৃথকভাবে বসতে পারে না।
3. অনুসর্গ হলো অব্যয় পদ, নির্দেশক হলো অর্থহীন ধ্বনিগুচ্ছ বা ধ্বনি।

সমাপ্ত।

Peasant Revolts in Bengal in the 19th Century

19 শতকের কৃষক বিদ্রোহ পরাধীন ভারতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হল বাংলার প্রথম কৃষক বিদ্রোহ। এরপর চোয়াড় বিদ্রোহ, পাইক বিদ্রোহ, পাগলপন্থী বিদ্রোহ, ময়মনসিংহ জেলার কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, ওয়াহাবি আন্দোলন প্রভৃতি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পরাধীন ভারতের ইতিহাসে কৃষক বিদ্রোহ জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। ইংরেজ সরকার কর্তৃক নির্মমভাবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অত্যাচার করা হয়। তবুও কৃষক বিদ্রোহ থেমে যায় নি।

কৃষক বিদ্রোহ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন। https://youtu.be/-fG9L6y6sAg




Bengali poem Ay Aro Bendhe Bendhe Thaki by Shankha Ghosh

শঙ্খ ঘোষ "আয় আরো বেড়ে বেড়ে থাকি" কবিতায় পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কবিতাটির উৎস " জলই পাষাণ হয়ে আছে " কাব্য। কবিতাটি দশম শ্রেণীতে পাঠ্য। পৃথিবী এখন যুদ্ধ ও হিংসার পীঠস্থান। কীভাবে পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব তা এই কবিতায় সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন। 



VIDYAPATI- VAISNAB PADABALI

VIDYAPATI- VAISNAB PADABALI
VIDYAPATI- VAISNAB PADABALI

SOURCE: ASIT K. BANDYAPADHAY.

SAID ALAOL সৈয়দ আলাওল

SAID ALAOL সৈয়দ আলাওল
SAID ALAOL সৈয়দ আলাওল


তথ্যসূত্র: অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায় .

KAMALAKANTA কমলাকান্ত

KAMALAKANTA কমলাকান্ত
KAMALAKANTA কমলাকান্ত

প্রলয়োল্লাস PRALOYOLLAS FOR MADHYAMIK STUDENTS.

বাংলা সাহিত্য আলোচনা 




 "প্রলয়োল্লাস"
 "প্রলয়োল্লাস"






 প্রশ্ন প্রলয়ল্লাস কবিতায় নজরুল ভয়ংকরের আসার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা লেখ 


 কাজী নজরুল ইসলাম প্রলয়ল্লাস কবিতা পরাধীনতার জ্বালা মোচনের জন্য মহাকালের আগমনের বন্দনা করেছেন  মহাকাল সর্বনাশী ক্ষমতার দ্বারা সমাজ থেকে অসুর নিধন করবেন  এই কবিতায় বিপ্লব  মহাকাল একাকার হয়ে গেছে ।

রনোন্মত্ত মহাকাল প্রলয়ের নেশা নত্য করছেন  তিনি ধমক এনে সিন্ধুপারের আগল ভেঙে ফেলেছেন  চণ্ডরূপ মৃত্যু গ্রহণ অন্ধকূপে মশাল জ্বেলে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে এগিয়ে আসছেন  তার কেশের রং ঝামর বর্ণ  কেশের ঝাপটায় যেন গগন কেঁপে ওঠে  জ্বালামুখী সর্বনাশী ধুমকেতু এই প্রলয়ের দেবতাকে স্বাগত জানাচ্ছে  প্রলয়র মহাকালের কোলে রক্তমাখা কৃপাণ ঝুলছে  তার অট্টহাসিতে ভয় পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে আছে ।

দ্বাদশ রবির তেজ  ্বালা যেন তার নয়নমণিতে শোভা পাচ্ছে  তার পিঙ্গল জটাজালে দিগন্তরের কাঁদন লুটিয়ে পড়ছে । চোখের জলে সাত সমুদ্রের বিশালতা  বিশ্বমায়ের আসন তার বাহুর উপর অবস্থান করছে  মাভৈঃ মন্ত্র ধ্বনিত হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে  জ্বরায় মরা মুমূর্ষুদের নতুন করে বাঁচতে শেখাবে প্রলয়ংকর  রুদ্রমূর্তিতে প্রলয়ের মত্ততায় অন্ধকার দূর করে পরাধীন ভারতবর্ষের জন্য শান্তি ও সুখ নিয়ে আসবে ।

মহাকালের সারথির রক্ত-তড়িৎ-চাবুকের আঘাতে ঘোড়া কেঁদে উঠছে । তার কান্নার ধ্বনি আকাশের বজ্র ও ঝড়-তুফানের সাথে তুলনীয়  মহাকালের রথের ঘোড়ার ক্ষুরের দাপটে নীল আকাশে উল্কা খসে পড়ছে । অন্ধ কারাগারের বন্ধ কুপে আলো জেগে ঠেছে  কবি রথের চাকার ঘরঘর ধ্বি শুনতে পাচ্ছেন  জীবনহারা অসুন্দরকে ছেদন করে নতুন সৃজন করতে তার শুভ আগমন  ভাঙ্গা-গড়া তার নিত্যলীলা  তার ভয়ঙ্কর রূপের মধ্যে চির সৌন্দর্য বিরাজ করছে  কবি এভাবে ভয়ংকরের আসার বর্ণনা করেছেন ।



প্রশ্ন প্রলয়ল্লাস কবিতা নজরুলের কবি মানসিকতার পরিচয় দাও ।


কাজী নজরুল ইসলামের লেখা প্রলয়ল্লাস কবিতাটি স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য বিপ্লবের ভাবনায় পূর্ণ  কবিতাটিতে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন কবি  পরাধীনতার বন্ধন মোচনের জন্য তিনি ভারতমাতার বীর ছেলেদের উৎসাহিত করেছেন  কঠোর সংগ্রামের মহাব্রত করতে হবে, তবে স্বাধীনতার সূর্য ভারতের আকাশে উদিত হবে ।

 নজরুল স্বাধীনতার দিনে পৌঁছানোর জন্য বিপ্লবের প্রতি আস্থা রেখেছেন  বিপ্লবের রক্তস্নাত পথ দিয়ে জাতির মুক্তি ঘটবে  এই কবিতায় কবির ইতিবাচক মনোভাবটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে  তিনি বিপ্লবের বাণীবাহি বিপ্লবীদের মহাকালের সাথে তুলনা করেছেন  মহাকালের প্রলয়নাচন ধ্বংসের স্পষ্ট বার্তা কবি শুনতে পেয়েছেন  কালবৈশাখীর ঝড়ে পরাধীনতার  জীর্ণ বাঁধন উড়ে যাবে  সিন্ধুপারের সিংহদ্বারের গল ভেঙে পড়েছে  মহাকাল বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে অন্ধকূপের আঁধার ঘোচাতে আসছেন  রক্তমাখা কৃপাণ ঝুলছে তার কোলে  তার চোখে যেন সূর্যের মতো তেজ বিকিরণ হচ্ছে  মুমূর্ষুদের সঞ্জীবনী সুধা দিতে মহাকালের এই প্রয়াস ব্যর্থ হবে না 

মহাকাল যেন কবির স্বপ্নের নায়ক যিনি ভারতমাতাকে হৃত গৌরব ফিরিয়ে দেবেন  ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বান্তকরণ সংগ্রাম চান তিনি  তাই বিপ্লবের ও বিপ্লবীদের জয়ধ্বনিতে মুখর হয়েছেন কবি  বিপ্লবের বাণীকে তিনি সমাজে সবার মনে ছড়িয়ে দিতে চান  সকলে মিলে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ সংগ্রাম করে ভারতের বুকে স্বাধীন যুগ স্থাপন করতে তিনি প্রয়াস হয়েছেন  আর সকলকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন  কবি নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা এখানে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে  একইসঙ্গে স্বাধীনতার স্বপ্ন ঘনিয়ে এসেছে তার দুচোখে ।

 প্রশ্ন বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর- ভয়ঙ্কর কে ? তার আগমনের কারণ কি ?


নজরুল ইসলাম তার লেখা প্রলয়োল্লাস কবিতা পরাধীনতার অন্ধকারের অবসানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছেন কিন্তু শান্তির সরল পথে স্বাধীনতা আসবে না মহাপ্রলয়ের রণ-ভেরী বেজে উঠেছে, মহাকাল প্রলয় নেশায় মত্ত হয়ে যেন অসুররূপী ইংরেজ শক্তিকে পরাভূত করতে আসছেন মুক্তি যুগের অগ্রদূত ভারত মাতার বীর বিপ্লবী সন্তানদের শক্তিকে কবি বৃহৎ পটভূমিকায় এঁকেছেন । মহাকালের রূপ ধরে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে তারা স্বাধীনতার পথের যাত্রী তারা দুরন্ত কালবৈশাখীসম দেশ উদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে তাঁরা অতি ভয়ঙ্কর, প্রলয় পাগল ।

 প্রশ্ন ওই নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়”।- তাৎপর্য লেখ ।


প্রলয়ল্লাস কবিতা নজরুল নবীনের জয়গান গেয়েছেন ভারতবাসীর পরাধীনতার গ্লানি মোচনের জন্য নবীন বিপ্লবীগ মহাপ্রলয় মত প্রলয়ের নেশা নত্য-পাগল মহাকালের রূপ ধরে তারা অসুররূ ইংরেজদের নিধনে বদ্ধপরিকর । বিপ্লবের আবেগ যেন কালবোশেখীর আগমন সূচিত করছে ভারতের পরাধীনতার শৃংখল ও দীনতা কালবৈশাখীর ঝড়ে উড়ে যাবে ভারত মাতার বীর সন্তানদের আত্মত্যাগের ও বিপ্লবের নিশান উছে কালবৈশাখী দুর্দান্ত ঝড়ে । এভাবে বিপ্লবীদের প্রতি অকুণ্ঠ হৃদয় সমর্থন জানিয়েছেন কবি ।

 প্রশ্ন তোরা সব জয়ধ্বনি কর”।- কবির এরূপ নির্দেশের কারণ কি ?


কবি নজরুল অগ্নিবীণা কাব্যের প্রলয়ল্লাস কবিতা বিপ্লবের আবেগ ও বিপ্লবীদের জয়গান গেয়েছেন কবি স্বপ্ন দেখেছেন, বিপ্লবের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হবে তবে এই বিপ্লব কোন একক মানুষের কীর্তি নয়, সকল ভারতবাসী স্বাধীনতার স্পৃহার প্রতি উদ্বুদ্ধ হলে, হৃদয়ের মধ্যে বিপ্লবের প্রদীপ জ্বালাতে পারলে, তবে পরাধীনতা মোচন সম্ভব হবে তাই কবি সকলকে বারবার জয়ধ্বি দিতে বলেছেন, যাতে সকলেই বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে সকল ভারতবাসীকে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাঙ্গণে দেখতে চেয়েছেন তিনি ।




প্রশ্ন ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর”।- চরাচর স্তব্ধ কেন ?


কাজী নজরুল ইসলামের লেখা প্রলয়োল্লাস কবিতাটি একটি দেশপ্রেমের কবিতা এই কবিতায় স্বাধীনতার মুক্তি পিয়াসী বিপ্লবীদের বীরত্বকে মহাকালের প্রলয় নাচনর রূপকে বর্ণনা করেছেন ভয়ঙ্কর মহাকাল যেন প্রলয়ের নেশায় মত্ত । তার কোলে আছে রক্তমাখা তরবারি । তাঁর কেশের ঝাপটায় গগন দুলে ওঠে, আর জ্বালামুখী ধুমকেতু তার পুচ্ নাচিয়ে মহাকালের বা মুক্তিদাতার আগমন সূচিত করেছে প্রলয়ের কালে মহাকালরূপী বিপ্লবীদের অট্টরোলে চরাচর স্তব্ধ হয়ে আছে চরাচর যেন বিপ্লবের দুর্দম শক্তিকে নতমুখে স্বাগত জানাচ্ছে ।

প্রশ্ন আসবে ঊষা অরুণ হেসে”।- তাৎপর্য লেখ ।


প্রলয়ল্লাস কবিতা কাজী নজরুল পরাধীনতার অন্ধকার মোচনের স্বপ্ন দেখেছেন । বিপ্লব যেন মহাকালের রূপ ধরে ইংরেজ নিধন করতে আসছেন মহাপ্রলয়ের মত্ততা চরাচর স্তব্ধ হয়ে আছে মাভৈঃ ধ্বনিতে স্বাধীনতার অনুরণন শুনতে পেয়েছেন কবি ভারতমাতার দুঃখ মোচন করতে তার বীর সন্তানরা মহাকালের রূপ ধরে মহাপ্রলয় মত্ত । জরায় মরা ভারতবাসীর পরাধীনতার শৃংখল ভাঙতে তারা বদ্ধপরিকর বিপ্লবীদের এই সংগ্রাম ব্যর্থ হবে না তাদের রক্তস্নাত বিপ্লবের পথ দিয়ে একদিন স্বাধীনতা আসবে বর্তমানের পরাধীনতার গ্লানিময় মহানিশার অবসান হবে এবং স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হবে- এমনই প্রত্যাশা করেন কবি নজরুল মহাদেবের কপালে পিঙ্গল চাঁদ সেদিন স্বাধীনতাসুখের পূর্ণিমায় আমাদের ঘর ভরিয়ে দেবে ।

 প্রশ্ন দ্বাদশ রবি বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন কটায়”।- তাৎপর্য লেখ ।


নজরুল ইসলামের লেখা প্রলয়ল্লাস কবিতাটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাবনায় পূর্ণ এই কবিতায় বিপ্লবের বার্তাবহ বিপ্লবীদের মহাকালের সাথে তুলনা করা হয়েছে বিপ্লবীদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাদের বীরত্বকে আকাশের সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন আকাশের বুকে দীপ্তমান সূর্যের মতো বিপ্লবীরা আপন শক্তিতে ও তেজে উজ্জ্বতাদের নয়ন থেকে অগ্নি বর্ষিত হচ্ছে । সেই আগুনে পরাধীনতার অপমান জ্বলে যাবে এভাবে বিপ্লবীদের জয়গান করেছেন তাদের ঐকান্তিক আত্মত্যাগের মাধ্যমে নবযুগের সূচনা ঘটতে চলেছে ।

প্রশ্ন মাভৈঃ শব্দের অর্থ কি ? কবি কেন এই শব্দটি উল্লেখ করেছেন ?


মাভৈঃ শব্দের অর্থ নির্ভয় বা ভয় করোনা ।

কবি নজরুল স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাক্ষেত্রে অসুররূ ইংরেজ নিধনের জন্য বিপ্লবীদের মরণপণ সংগ্রাম উদ্বোধন করেছেন প্রলয়ল্লাস কবিতা । কবি ভয় না করার নির্দেশ দিয়েছেন  নির্ভীকচিত্তে প্রলয় সৃষ্টি করতে হবে  ভয়ানক মহাকালের প্রলয়নৃত্যের কারণে চরাচর স্তব্ধ  পরাধীনতার বন্ধন মোচনের দিন সমাগত  প্রলয়ের শেষে জয়টিকা বিপ্লবীদের কপালে শোভা পাবে  মরকে জয় করে এই বিপ্লবীরা হয়ে উঠবে মরণজয়ী  সেদিন পূর্ণিমা ভাসবে ভারতবর্ষ  অনাগত স্বাধীন ভারতের স্বপ্নকে সার্থক করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকদের ভয়হন হতে হবে ।

প্রশ্নঃ ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর- তাৎপর্য লেখ ।


প্রলয়ল্লাস কবিতায় কবি নজরুল মহাকালের রুদ্র রূপর বন্দনা গান করেছেন  মহাকাল অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছেন  তার আগমনের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন কবি  রূপকের আশ্রয় কবি বিপ্লবকে স্বাগত জানিয়েছেন  ভারত মায়ের দামাল ছেলেরা ইংরেজ র অসুরদের নিধন করতে মহাকালের রূপ ধারণ করেছেন  কিন্তু, এই ধ্বংস দেখে পরাধীন ভারতবাসীর ভয় পাবার কারণ নেই  ভারতবাসীকে স্বাধীনতা দেবার জন্য এই প্রলয় আসছে  সমাজের বুকে নতুন দিন আসছে, যা হবে স্বাধীনতার সুখে পূর্ণ  জীবনহারা অসুন্দরকে নিধন করার জন্য মহাকালের আগমন হচ্ছে  জরায় মরা ভারতবাসীর আনন্দের দিন এটি ।

 প্রশ্ন রনিয়ে ওঠে ঘোড়ার কাঁদবজ্রগানে ঝড়-তুফানে প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা কর ।


প্রলয়ল্লাস কবিতায় কবি নজরুল স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছেন  স্বাধীনতা-উত্তরকালে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় ভারতবাসীর ঘর আনন্দে ভরে উঠবে  কিন্তু, স্বাধীনতা শান্তির মসৃণপথে আসবে না  মহাপ্রলয়ের মহাপ্রান্তরে আত্মত্যাগ ও বিপ্লবের হাত ধরে আসবে স্বাধীনতা  সমাজের বুকে মহাকালের প্রলয়নৃত্য ঘটতে চলেছে ।  মহাকালের সারথি স্বাধীনতা কালে অতি দ্রুত পৌঁছানোর জন্য রক্ত তড়িৎ চাবুক দিয়ে সময় রূপ ঘোড়াকে আঘাত করছে  আর চাবুকের আঘাতে মহাকালের রথের ঘোড়া যেন কেঁদে উঠছে যা বজ্রগান, ঝড়-তুফানের সাথে তুলনা করেছেন কবি  তার খুরের আঘাতে উল্কা খসে পড়ছে  এভাবে পরাধীনতার পাষাণ ভেদ করে একদিন স্বাধীনতার আগমন ঘটবে




 বাংলা সাহিত্য আলোচনা,